ছবির মতোই সুন্দর ছিল আমার গ্রামটা...

বর্ষা মৌসুমে নৌকা ছাড়া চলাচলের কোন উপায় থাকতোনা। যেন মহসড়কের পাশে বিচ্ছিন্ন ছোটএকটা দ্বীপ।

সমস্যা যত বড়ই হোক, আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে

আমরা অবশ্যই পারব৷ সমস্যা যত বড়ই হোক না কেন, আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে অনুপ্রেরণা জোগায়৷ কিন্তু সমস্যাকে নিজের চোখে না দেখলে শুধু আশা দিয়ে সমস্যা সমাধান করা যায় না৷

ঘুরে আসুন নারায়ণগঞ্জের সব দর্শনীয় স্থানে

অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর আমাদের বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি জেলায়ই রয়েছে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। যা আমাদের দেশকে করেছে আরো সমৃদ্ধ। শত বছর ধরে লাখো পর্যটককে করেছে আকৃষ্ট।

মানবসেবাই সর্বোত্তম ধর্ম: ফাদার তেরেসা

অসহায়, দুস্থ মানুষের সহায়তাই তার ধ্যান-জ্ঞান।সহিংসতার বিপরীতে তিনি অসহায়ের ত্রানকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন।তিনি পাকিস্তানের আবদুল সাত্তার ইদি।অসম্ভব মানবসেবার কারনে ৮৪ বছর বয়সী এই ব্যক্তি তার দেশে ফাদার তেরেসা নামেই বেশি পরিচিত।

‘মানসিক প্রশান্তির জন্য সাইকেল’

যাত্রা পথে পরিবহন নিয়ে দুশ্চিন্তা আর ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে বিকল্প হলো একটা বাই সাইকেল। তাছাড়া ইদানিং স্বাস্থ্যটার দিকেও মনে হচ্ছে একটু যত্ন নেয়া দরকার।

সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

সমস্যা যত বড়ই হোক, আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে


মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের অন্যতম। তাঁর জন্ম ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেন এবং মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি মাইক্রোসফটের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে জনকল্যাণমূলক নানা কাজে যুক্ত আছেন।

বিল গেটস: অভিনন্দন, ২০১৪ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা৷ মেলিন্ডা ও আমি আজ এখানে উপস্থিত হতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত৷ তোমাদের এই ক্যাম্পাস অনেক দিক থেকেই অসাধারণ৷ তবে আমাদের যদি একটি শব্দে বলতে হয় স্ট্যানফোর্ডের কোন বিষয়কে আমরা সবচেয়ে ভালোবাসি, তা হবে আশাবাদী মনোভাব৷

১৯৭৫ সালে এই আশা নিয়েই আমি বোস্টনের এক কলেজ ছেড়ে এসে কাজে নেমে পড়েছিলাম৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কম্পিউটার ও সফটওয়্যার পৃথিবীজুড়ে মানুষের জীবনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করতে পারবে, পৃথিবীকে আরও অনেক উন্নত করে তুলবে৷ কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে৷ আমরা যা শিখেছি, আজ সেসব তোমাদের বলতে চাই৷ আর জানাতে চাই, কীভাবে আমরা সবাই আরও অনেক মানুষের জন্য অনেক কিছু করতে পারি৷

যখন পল অ্যালেন আর আমি মাইক্রোসফট শুরু করেছিলাম, তখন আমদের লক্ষ্য ছিল কম্পিউটার ও সফটওয়্যারের ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের কাজে লাগানো৷
১৯৯৭ সালে আমি ব্যবসার কাজে প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকায় যাই৷ একদিন আমি কৌতূহলবশত শহরের একটু দূরে সোয়েটো নামে একটা জায়গায় যাই; এমন জায়গা আমি জীবনে কখনো দেখিনি৷ মাইক্রোসফট সেখানে একটি কমিউনিটি সেন্টারে কম্পিউটার ও সফটয়্যার বিতরণ করেছিল, যেভাবে আমেরিকায় আমরা কাজ করতাম৷ কিন্তু আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বুঝে গেলাম, এটা আমেরিকা নয়৷ এর আগে আমি দারিদ্র্যকে দেখেছিলাম পরিসংখ্যানে, নিজের চোখে নয়৷ সেখানে গিয়ে আমি দেখলাম, কীভাবে মানুষ বিদ্যুৎ, পানি, টয়লেট ছাড়াই বস্তিতে থাকছে৷ বেশির ভাগের পায়েই কোনো জুতা ছিল না, জুতা পায়ে হাঁটার মতো রাস্তাও ছিল না৷ যে কমিউনিটি সেন্টারে আমরা কম্পিউটার দান করেছিলাম, সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ছিল না৷ তাই তারা ২০০ ফুট লম্বা তার দিয়ে ডিজেলচালিত একটি জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎ-সংযোগ নিয়ে কম্পিউটার চালিয়ে রেখেছিল৷ অবস্থা দেখে আমি ভালোভাবেই বুঝলাম, যে মুহূর্তে আমি আর আমার সঙ্গের লোকজন চলে যাব, তৎক্ষণাৎ এই জেনারেটরও অন্য কোথাও চলে যাবে৷ আর কমিউনিটি সেন্টারের লোকেরাও তাদের জীবনের অন্য হাজার সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত হয়ে পড়বে; সেসব সমস্যা কখনো কম্পিউটার দিয়ে সমাধান করা যায় না৷

গণমাধ্যমের সামনে এসে আমি আগে থেকে তৈরি করে রাখা বক্তৃতা পড়ছিলাম৷ বলছিলাম, ‘সোয়েটো প্রযুক্তির বিভাজনকে ঘুচিয়ে দেওয়ার যাত্রায় একটি মাইলফলকের নাম৷’ কিন্তু মুখে যা-ই বলি, আমি বুঝতে পারছিলাম, এসব কথার কোনো অর্থ নেই৷সোয়েটোতে যাওয়ার আগে আমি ভাবতাম, আমি পৃথিবীর সমস্যা বুঝি, কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো নিয়েই আমার কোনো ধারণা ছিল না৷ আমার এত অসহায় লেগেছিল যে আমি নিজের বিশ্বাসকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলাম, আদৌ কি উদ্ভাবনের মাধ্যমে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব? আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, দ্বিতীয়বার আফ্রিকায় পা দেওয়ার আগে আমাকে বুঝতে হবে দারিদ্র্য আসলে কী৷
অনেক পরে দক্ষিণ আফ্রিকায় আমি একটি যক্ষা হাসপাতাল দেখতে গিয়েছিলাম৷ সেটি একটি বিশেষ ধরনের যক্ষা রোগীদের জন্য, যাদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগেরও কম৷ গোটা হাসপাতাল রোগীদের ভিড়ে উপচে পড়ছে৷ রোগীদের মধ্যে আমি এক নারীর সঙ্গে কথা বললাম, তার বয়স মাত্র ত্রিশের কোঠায়৷ সে আগে এক যক্ষা হাসপাতালে কাজ করত, একদিন তার নিজেরও যক্ষা ধরা পড়ে, সঙ্গে এইডস৷ সে জানত, তার দিন ফুরিয়ে এসেছে৷ আর তার মৃত্যুর পর যখন সেই বিছানা খালি হয়ে যাবে, সেখানে জায়গা করে নিতেও রোগীদের এক বিশাল লাইন অপেক্ষা করে আছে৷ তারা অপেক্ষা করছে সেই দিনের৷
আমি গাড়িতে উঠে সেখানকার এক ডাক্তারকে বললাম, ‘হ্যাঁ, আমি জানি এ ধরনের যক্ষা সারিয়ে তোলা মুশকিল৷ কিন্তু কোনো না কোনো উপায় নিশ্চয়ই আছে৷ এসব মানুষের জন্য আমাদের কিছু করতেই হবে৷’
আমি আজ আনন্দের সঙ্গে বলতে পারি এ বছর আমরা যক্ষার এক নতুন ধরনের ওষুধের পরীক্ষা করতে যাচ্ছি৷ আগে যেখানে ১৮ মাস ধরে প্রায় দুই হাজার ডলার খরচের পরও শতকরা ৫০ জনের বেশি রোগীকে সুস্থ করা যেত না, এখন সেখানে ছয় মাসের চিকিৎসায় ১০০ ডলারের কম খরচেই শতকরা ৮০ থেকে ৯০ জন রোগীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হবে৷ এখানেই আশাবাদের শক্তি নিহিত৷
কে বলেছে আমরা দারিদ্র্য কিংবা রোগব্যাধিকে নির্মূল করতে পারব না? আমরা অবশ্যই পারব৷ সমস্যা যত বড়ই হোক না কেন, আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে অনুপ্রেরণা জোগায়৷ কিন্তু সমস্যাকে নিজের চোখে না দেখলে শুধু আশা দিয়ে সমস্যা সমাধান করা যায় না৷

আমি হতাশাবাদীদের দলে নই৷ কিন্তু আমাদের স্বীকার করতে হবে যে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে যদি আমরা বৈষম্য দূরীকরণের কাজে না লাগাই, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা এমন সব উদ্ভাবন নিয়ে বসে থাকব, যা পৃথিবীকে আরও বিভক্ত করে ফেলবে৷ উদ্ভাবন দিয়ে কী হবে, যদি তা স্কুলে শিক্ষার মান না বাড়ায়? যদি ম্যালেরিয়া নির্মূল করা না যায়, দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব না হয়, দরিদ্র কৃষকের অন্নের নিশ্চয়তা না থাকে?

তোমরা স্নাতকেরা অসংখ্য উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেবে, পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যাবে৷ তোমাদের বয়সে আমি পৃথিবীকে যতটা চিনতাম, আমি বিশ্বাস করি, আজ তোমরা তার চেয়ে অনেক বেশি জানো৷ আমি যা করেছি, তোমরা তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু করতে পারবে, যদি তোমরা এতে তোমাদের মনপ্রাণ ঢেলে দাও৷ আমি সেই প্রত্যাশায় রইলাম৷

সূত্র: স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট। ১৫ জুন, ২০১৪ যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেওয়া বিল গেটসের বক্তব্যের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ করেছেন  অঞ্জলি সরকার

মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

মানব সেবায় স্বর্গীয় টেরিজা ‘মাদার তেরেসা’

কেবল সেবা নয়, মানুষকে দাও তোমার হৃদয়। হৃদয়হীন সেবা নয়, তারা চায় তোমার অন্তরের স্পর্শ’। এরকম নিছক একটি বাণীই বলে যাননি, আমৃত্যু আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে সারাবিশ্বের মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন মহীয়সী নারী মাদার তেরেসা।

সমাজের যারা বিভিন্ন দিক থেকে অবহেলিত, মাদার তেরেসা তাদেরই বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। ৫ সেপ্টেম্বর ছিল তাঁর ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।

জন্ম
মাদার তেরেসা রোমান ক্যাথলিক সমপ্রদায়ভুক্ত বিশ্বখ্যাত সমাজসেবিকা। তার জন্ম আলবেনিয়ায় ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট। অটোম্যান সাম্রাজ্যের ইউস্কুবে প্রাথমিক লেখাপড়া সম্পন্ন করেন জন্মশহর স্কেপিয়েতে। তার পুরো নাম আনিয়েজ গঞ্জে বয়াজিউ। ডাক নাম গোস্কসা। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তার বাবা ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ। ১৯১৯ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে মাদার তেরেসা পিতৃহারা হন। পিতার মৃত্যুর পর মা তাকে রোমান ক্যাথলিক আদর্শে লালন-পালন করেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি ঠিক করলেন সন্যাসব্রত গ্রহণ করবেন।

১৮ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে একজন মিশনারি হিসেবে সিস্টার্স অফ লোরেটো সংস্থায় যোগ দেন। মা আর দিদিদের সঙ্গে মাদার তেরেসার আর কোনোদিন দেখা হয়নি।

মানব প্রেমের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্ম সাধনা
১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে একদিন সিস্টার তেরেসা তার ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য খাবার খুঁজতে রাস্তায় বের হলেন। রাস্তায় তখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অগণিত মানুষের লাশ। এসব লাশ দেখে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন তিনি। ভয়ে তার শরীর থরথর করে কেঁপে ওঠে। দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের আর্তনাদে তিনি অস্থির হয়ে ওঠেন। এরইমাঝে হঠাৎ লরি বোঝাই সেনাদল, সিস্টার তেরেসাকে দাঁড় করালেন এবং তাড়াতাড়ি মঠে ফিরে যেতে নির্দেশ দিলেন। সিস্টার তেরেসা শান্তভাবে তাদের জবাব দিলেন, আমার মঠের তিন শ’ মেয়ের এতটুকু খাবার নেই, তাদের জন্য খাবার চাই-ই। ফৌজির দল সিস্টারের সাহস আর অন্যের প্রতি ভালোবাসা দেখে অবাক হয়ে গেলেন। তারা তখন সিস্টার তেরেসার জন্য চাল সংগ্রহ করে তাকে মঠে পৌঁছে দিলেন।১৯৪৮ সালে দরিদ্রের মাঝে মিশনারি কাজ শুরু করেন মাদার তেরেসা। এ সময় তিনি প্রথাগত লোরেটো অভ্যাস ত্যাগ করেন। পোশাক হিসেবে পরিধান করেন নীল পারের একটি সাধারণ সাদা সুতির বস্ত্র। এ সময়ই ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করে বস্তি এলাকায় কাজ শুরু করেন। প্রথমে মতিঝিলে একটি ছোট স্কুল স্থাপনের মাধ্যমে শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ক্ষুধার্ত ও নিঃস্বদের ডাকে সাড়া দিতে শুরু করেন। তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করতে থাকেন। তার এই কার্যক্রম অচিরেই ভারতীয় কর্মকর্তাদের নজরে আসে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও তার কাজের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

১৯৫০ সালে কলকাতায় তিনি মিশনারিজ অফ চ্যারিটি নামে একটি সেবাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। সুদীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে মাদার তেরেসা দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবা করেন। একই সঙ্গে মিশনারিজ অফ চ্যারিটির বিকাশ ও উন্নয়নেও অক্লান্ত পরিশ্রম করেন তিনি।

১৯৫২ সালে মাদার তেরেসা কলকাতা নগর কর্তৃপক্ষের দেয়া জমিতে মুমূর্ষুদের জন্য প্রথম আশ্রয় ও সেবা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। ভারতীয় কর্মকর্তাদের সহায়তায় একটি পরিত্যক্ত হিন্দু মন্দিরকে কালিঘাট হোম ফর দ্য ডাইং-এ রূপান্তরিত করেন। এটি ছিল দরিদ্র্যদের জন্য নির্মীত দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র। পরবর্তীতে এই কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে রাখেন নির্মল হৃদয়। এই কেন্দ্রে যারা আশ্রয়ের জন্য আসতেন তাদের চিকিৎসা সুবিধা এবং সম্মানের সাথে মৃত্যু বরণের সুযোগ করে দেয়া হয়। মুসলিমদের কুরআন পড়তে দেয়া হয়, হিন্দুদের গঙ্গার জলের সুবিধা দেয়া হয় আর ক্যাথলিকদের প্রদান করা হয় লাস্ট রাইটের সুবিধা। এ বিষয় তেরেসা বলেন, "A beautiful death is for people who lived like animals to die like angels — loved and wanted."

তেরেসার এই মানবসেবা বা মিশনারি কার্যক্রম প্রথমে ভারত অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮২ সালে বৈরুত অবরোধের চূড়ান্ত প্রতিকূল সময়ে মাদার তেরেসা যুদ্ধের একেবারে ফ্রন্ট লাইনের হাসপাতালে আটকে পড়া ৩৭ শিশুকে উদ্ধার করেন। সমাজতান্ত্রিক শাসনের সময়ে পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশেই মিশনারি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল। এ সময়েই মাদার তেরেসা মিশনারিস অফ চ্যারিটির কাজ পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন।

মাদার তেরেসা ইথিওপিয়ার ক্ষুধার্তদের কাছে যেতেন, ভ্রমণ করতেন চেরনোবিল বিকিরণে আক্রান্ত অঞ্চল। আমেরিকার ভূমিকম্পে আক্রান্তদের মাঝে সেবা পৌঁছে দিতেন। ১৯৯১ সালে মাদার তেরেসা প্রথমবারের মতো মাতৃভূমি তথা আলবেনিয়াতে ফিরে আসেন। এদেশের তিরানা শহরে একটি ‘মিশনারিস অফ চ্যারিটি ব্রাদার্স হোম’ স্থাপন করেন।
১৯৯৬ সালে পৃথিবীর ১০০টিরও বেশি দেশে মোট ৫১৭টি মিশন পরিচালনা করছিলেন তিনি। মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে যে চ্যারিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল— সময়ের ব্যবধানে তা কয়েক হাজারে পৌঁছায়। তারা সবাই বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪৫০টি কেন্দ্রে মানবসেবার কাজ করে যাচ্ছিলেন।

স্বীকৃতি
গত শতাব্দের সত্তরের দশকের মধ্যেই সমাজসেবী ও অনাথদের বন্ধু হিসেবে মাদার তেরেসার খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ১৯৭৯ সালে তিনি তার সেবাকার্যের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। আর ১৯৮০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরতœ লাভ করেন।

মৃত্যু
১৯৮৩ সালে পোপ জন পল ২ এর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে রোম সফরের সময় মাদার তেরেসার প্রথম হার্ট অ্যাটাক হয়। ১৯৮৯ সালে আবার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর তার দেহে কৃত্রিম পেসমেকার স্থাপন করা হয়। ১৯৯১ সালে মেক্সিকোতে থাকার সময় নিউমোনিয়া হওয়ায় হৃদরোগের আরও অবনতি ঘটে। এই পরিস্থিতিতে তিনি মিশনারিস অফ চ্যারিটির প্রধানের পদ ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব করেন। কিন্তু চ্যারিটির নানরা গোপন ভোটগ্রহণের পর তেরেসাকে প্রধান থাকার অনুরোধ করে। অগত্যা তেরেসা চ্যারিটির প্রধান হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৯৭ সালের ১৩ মার্চ মিশনারিস অফ চ্যারিটির প্রধান পদ থেকে মাদার তেরেসা সরে দাঁড়ান। পরে ওই বছরেরই ৫ সেপ্টেম্বর কল্যাণব্রতী এই নারী ইহধাম ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর পর পোপ দ্বিতীয় জন পল তাকে স্বর্গীয় আখ্যা দেন। এবং তিনি কলকাতার স্বর্গীয় টেরিজা নামে পরিচিত হন।

বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

দেড় বছরে ২০৭ গার্মেন্টস বন্ধ, বেকার দেড় লাখ

দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি এবং রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্পে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই প্রায়ই দু-একটি করে কারখানা বন্ধ হচ্ছে। রানা প্লাজা ধসের পর থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। বিজিএমইএ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিশ্বমানের এবং দেশের সবচেয়ে বড় গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান হলমার্ক গ্রুপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বেকার হয়ে পড়েছে প্রায় ৪৫ হাজার শ্রমিক।

সর্বশেষ ১ সেপ্টেম্বর মিরপুরের সেকশন-৭ এ পূরবী সুপার মার্কেটের উপর স্থাপিত ইমাকুলেট প্রাইভেট লিমিডেট গার্মেন্টসটি বন্ধ করে দেয় মালিকপক্ষ। এর কয়েকদিন আগে একই মালিকের মিরপুর-১ এ অবস্থিত দুটি কারখানাও বন্ধ হয়ে যায়।

বিজিএমইএ সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বন্ধ হওয়া ২০৭টি কারখানার মধ্যে ২০ শতাংশ হচ্ছে শিফট হওয়া, ৪০ শতাংশ শেয়ার্ড বিল্ডিং কারখানা। বাকী কারখানাগুলো সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা কারখানা। তবে এর মধ্যে ভালো মানের কারখানা ৫ শতাংশেরও কম। পারপাসমেড বিল্ডিংয়ের কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি।

এই কর্মকর্তা আরো জানান, ইদের আগে বিভিন্ন জায়গায় আরো ২০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। যা বিজিএমইএ জানেনা বা বিজিএমইএকে জানানো হয়নি। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০০ কারখানা বন্ধ হওয়ার কথা জানান তিনি।

তিনি বলেন, স্ট্যান্ডার্ড মানের কোনও কারখানা বন্ধ হয়নি, সবই নরমাল কারখানা। অন্যদিকে শিফট হওয়া কারখানাগুলো ঢাকায় বন্ধ করে গাজীপুর আশুলিয়ায় একই নামে চালু করছে মালিকরা।

জানা গেছে, আগে বড় কারখানাগুলো বেশি করে পোশাকের অর্ডার নিয়ে অন্য কারখানায় সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করাতো। এবং তাদের নামে রপ্তানি হত। কিন্তু রানা প্লাজা ধসের পর বড় বড় বায়াররা কারখানার পরিবেশ ও মান যাচাই-বাছাইয়ের পর অর্ডার দেন। তারা শেয়ার্ড বিল্ডিংয়ে অর্ডার বন্ধ করে দিয়েছেন।

কোনো নামি-দামি ব্র্যান্ড খারাপ পরিবেশে তার কোম্পানির পোশাক তৈরি করে বদনাম কামাতে চান না। আর দেশে ভালো মানের কম্প্লায়েন্স কারখানাগুলোও সাব-কন্ট্রাক্টে এখন আর কাজ করাচ্ছেন না। তাই ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো কাজ না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রানা প্লাজা ধসের পর থেকে এ শিল্প কঠিন চাপের মুখে পড়ে। দেশে বিদেশে এ শিল্পের ইমেজ নষ্ট হয়। প্রশ্ন উঠে কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে। ফলে ক্রেতাদের দুটি জোট এ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স কারখানা পরিদর্শনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারা গত বছরের নভেম্বর থেকে কারখানা পরিদর্শন শুরু করে।

এ্যাকর্ড অ্যালায়েন্সের কারখানা পরিদর্শন কর্মসুচির পর নিরাপত্তা ইস্যুতে ঝুঁকিপূর্ন হওয়ায় ২১ টি কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া রানা প্লাজা ধসের পর অনেক ক্রেতা এদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে রপ্তানি আদেশও কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন গার্মেন্টস মালিকরা।

বর্তমানে বিজিএমইএ সদস্যভূক্ত সাড়ে তিন হাজার কারখানা চালু রয়েছে। যদিও বিজিএমইএর সদস্য কারখানার সংখ্যা পাঁচ হাজার ৭৫১টি। এর মধ্যে ডিহোল্ডার আছে দুই হাজার ২০০ কারখানা। বিভিন্ন কারণে ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হলেও ২০১৪ সালে নতুন কারখানা হয়েছে ৮০টি, ২০১৩ সালে হয়েছে ১৪০টি আর ২০১২ সালে ২০০ টি কারখানা নতুন করে স্থাপন করা হয়েছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কারখানা বন্ধের পাশাপাশি নতুন কারখানা করার হারও কমছে।

কারখানা বন্ধ হওয়া প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, কারখানা বন্ধ হওয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। এক নম্বর কারণ হচ্ছে রানা প্লাজা ধসের প্রভাবে ক্রয় আদেশ কমে যাওয়া। এছাড়া এ্যাকর্ড অ্যালায়েন্সর কারখানা পরিদর্শন, শেয়ার্ড বিল্ডিং কারখানা থাকার কারণে ক্রেতারা অর্ডার না দেওয়া, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির কারণে মালিকরা কারখানা চালাতে না পারা এসব কারণেও কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

প্রতিদিনই কোনো না কোনো কারখানার সমস্যা বিজিএমইএতে সমাধান করা হচ্ছে। প্রতিদিনই দুই একটি করে কারখানা বন্ধ হচ্ছে। কারখানার কাজ না থাকায় আরো কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানান তিনি।

হলমার্ক গ্রুপের মত বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান যদি এভাবে একের পর এক বন্ধই থেকে যায় তাহলে অদুর ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতির চাকা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

বিশেষজ্ঞরা  মনে করেন, বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের মত অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিকে সচল করতে সরকারের একটু সদিচ্ছাই যতেষ্ঠ। সমঝোতার মাধ্যমে সরকারই পারে গার্মেন্টস শিল্পের সুনাম অক্ষুন্ন রেখে দেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে। (জুহা)

বুধবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৪

মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া অবৈধ ইসরাইলের ইতিকথা




গত ১৫ই মে ছিল ইহুদিবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার বার্ষিকী। এ দিনটি ফিলিস্তিনসহ মুসলিম বিশ্বের কাছে ‘নাকাবা দিবস’ হিসেবে পরিচিত। ‘নাকাবা’ অর্থ হলো বিপর্যয় । ১৯৪৮ সালের এ দিনেই আনুষ্ঠানিকভাবে দখলদার ইসরাইল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ বিষয়েই এখানে আমরা বিস্তারিত আলোচনার প্রয়াস পাব।

নিঃসন্দেহে গত দুইশ’ বছরের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধের যেসব ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে সবচেয়ে কষ্টদায়ক হলো- ইহুদিবাদীদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল। ফরাসি গবেষক রুযে গারুদি বলেছেন, “রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্যই ইহুদিবাদের উৎপত্তি। ইহুদিবাদীরা তাদের অবৈধ লক্ষ্য হাসিল করতে ইহুদি ধর্মকে অপব্যবহার করছে।” ইহুদিবাদীরা গত কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি জাতির ওপর চরম দুঃখ-দুর্দশা চাপিয়ে দিয়েছে। সেখানে চালানো হচ্ছে জাতিগত নিধনযজ্ঞ। ফিলিস্তিন দখল করে সেখানে এমন একটি অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকেই সংকটের গভীরে নিক্ষেপ করেছে।

অবৈধ ইসরাইলের কারণে গত ৬৬ বছর ধরে গোটা মধ্যপ্রাচ্যই অশান্তি ও অনিরাপত্তার আগুনে জ্বলছে। এর জন্য সাম্রাজ্যবাদী সরকারগুলোর ক্ষমতালিপ্সাই প্রধান কারণ। ইসলামী জগতের একেবারে কেন্দ্রে ইহুদিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে সুদূরপ্রসারী অশুভ লক্ষ্য কাজ করেছে, তা বোঝা যায় ইতিহাস ঘাটলেই। ঊনবিংশ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধে আধিপত্যের বলয় বাড়ানো নিয়ে তিন ইউরোপীয় দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিল। বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তারা নানা অপকৌশল অবলম্বন করছিল। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ওপরও তাদের লোলুপ দৃষ্টি ছিল। কারণ ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে এই ফিলিস্তিন। ভৌগলিক দিক থেকে এটি একটি কৌশলগত অঞ্চল। সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের শাসনামলে ফিলিস্তিনকে নিজের উপনিবেশে পরিণত করার জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালায় ফ্রান্স।

ফ্রান্সের ষড়যন্ত্রের বিষয়টি টের পেয়ে এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নেয় ব্রিটেন। এ পরিকল্পনার আওতায় সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়। এরই আওতায় দখল হয়ে যায় কয়েক হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারক ফিলিস্তিন। ওসমানীয় সাম্রাজ্য যখন ক্ষয়িষ্ণু তখন পাশ্চাত্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিপ্লব চলছিল। এ অবস্থায় ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনন্মুখ পরিস্থিতি ইউরোপকে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয়। তাদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য দু’টি জিনিস প্রয়োজন ছিল। এক- মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপের একাংশ নিয়ে গঠিত উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা। দুই- টুকরো টুকরো ভূখণ্ডে পাশ্চাত্যের স্বার্থ সংরক্ষণকারী পুতুল সরকার বসানো।

ওসমানী সাম্রাজ্যের খলিফা দ্বিতীয় বায়েজিদ
ওসমানীয় সামাজ্যের পতন ও মুসলিম বিশ্বের প্রভাব ক্ষুণ্ন করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৮৯৭ সালেথিয়োডর হার্জেল ও তার সহযোগীরা সুইজারল্যান্ডে এক সমাবেশের মাধ্যমে বিশ্ব ইহুদিবাদ সংস্থা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। হার্জেল পরবর্তীতে ইহুদিবাদের জনক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বিশ্বে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা তার বড় লক্ষ্য। কোথায় ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে, সে ইস্যু সামনে আসলে বিভিন্ন এলাকার নাম উত্থাপিত হয়। হার্জেল ফিলিস্তিনেই ইহুদিদের জন্য প্রথম রাষ্ট্র ও সরকার গঠনের পক্ষে ছিলেন। ওসমানীয় সাম্রাজ্য হার্জেলের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজি না হওয়ায় হার্জেলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী ও ইহুদিবাদীদের নানা ষড়যন্ত্রের মাঝেই শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধে নয়া শক্তির সমীকরণের এক পর্যায়ে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এরপর বিশ্ব ইহুদিবাদ সংস্থা নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে। ইহুদিবাদের প্রতি ব্রিটিশ সামাজ্যবাদের সমর্থন ফিলিস্তিনে প্রথম ইহুদিবাদী সরকার গঠনের ক্ষেত্র তৈরি করে।১৯১৭ সালে উপনিবেশবাদী ব্রিটেন ও বিশ্ব ইহুদিবাদের মধ্যে সম্পর্কের নয়া অধ্যায় শুরু হয়। ওই বছর তৎকালীন
ইসরাইলী রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা হার্জেল
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। ১৯১৮ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রসংঘ ফিলিস্তিনের ওপর ব্রিটেনের একাধিপত্যকে স্বীকৃতি দেয়। তিন দশক ধরে ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে ছিল ফিলিস্তিন। তখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময় ছিল এটি। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসকরা ফিলিস্তিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব কাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছিল। এই তিন দশকে বিশ্ব ইহুদিবাদ সংস্থা ফিলিস্তিনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফিলিস্তিনের দিকে ইহুদিদের ঢল নামে। নানা দেশ থেকে তাদেরকে সেখানে নিয়ে আসা হয়। ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে ইহুদিবাদীদের জন্য স্থায়ী আবাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। শক্তি প্রয়োগ করে ফিলিস্তিনিদেরকে ভিটেমাটি ছাড়া করা হয়।

এ সময় ব্রিটিশ সরকারের মদদে ইহুদিবাদীরা গোপনে ‘হাগানা’ নামের সন্ত্রাসী সেনাদল গঠন করে। তারা নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদেরকে হত্যার মিশনে নামে। একের পর এক বহু ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে। এ অবস্থায়  পাশ্চাত্যের পুঁজিপতিরা ইহুদিবাদীদেরকে ব্যাপক অর্থ সাহায্য দেয়। এ অর্থে তারা ফিলিস্তিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কারখানা ও বিভিন্ন ইহুদিবাদী দপ্তর প্রতিষ্ঠা করে,যাতে সুযোগ এলেই ইহুদিবাদী সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া যায়। অবশেষে ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ অন্যায়ভাবে ফিলিস্তিনকে ভাগ করার ইশতেহার প্রকাশ করে। এরই ভিত্তিতে ফিলিস্তিনকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। এক অংশ দেয়া হয় ইহুদিবাদীদেরকে। সেখানে তারা ইহুদি সরকার প্রতিষ্ঠা করে। অন্য অংশ দেয়া হয় ফিলিস্তিনিদেরকে।

একপেশে ওই ইশতেহারে  ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য ফিলিস্তিনের মোট ভূখণ্ডের অর্ধেককে বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু বিশ্বের মোড়লদের ইহুদিবাদপ্রীতির কারণে আজও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেও মোতায়েন রয়েছে ইহুদিবাদী বাহিনী। জাতিসংঘের একপেশে ইশতেহারের পক্ষে ভোট দিয়েছিল ৩৩টি দেশ। এর মধ্যে ছিল আমেরিকা, ব্রিটেন ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ। ১৩টি দেশ ইশতেহারের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল। ভোটদানে বিরত ছিল আরও দশটি দেশ। ইশতেহার প্রকাশের এক বছর পর ফিলিস্তিন অংশটিও ইহুদিবাদীরা দখল করে নেয়। এর ফলে সেখানে নেমে আসে হাহাকার। শরণার্থীতে পরিণত করা হয় অসংখ্য ফিলিস্তিনিকে। তার হয়ে পড়েন সহায়-সম্বলহীন।

ফিলিস্তিনি মুসলমানদের এ দুর্দশার মাঝে ইসলামি ও আরব দেশগুলোর মধ্যে অনৈক্য ও বিবাদ ছিল শতাব্দির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। এই সুযোগে অবশেষে ১৯৪৮ মাসের মে মাসে ফিলিস্তিন থেকে ব্রিটিশ বাহিনী চলে যায়। শুরু হয় ইহুদিবাদীদের দুঃশাসন।

১৯৫০’র দশকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মায়ার বলেছিলেন, “ফিলিস্তিনের বর্তমান প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্ম আর ফিলিস্তিনের কথা মনেই করতে পারবে না।” ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ইহুদিদের ভূখণ্ড বলেও তিনি জোর গলায় দাবি করেছিলেন।

তবে ফিলিস্তিনিদের সাহসিকতা ও প্রতিরোধ প্রমাণ করে গোল্ডা মায়ারের মতো ইহুদিবাদীদের স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি। কারণ ফিলিস্তিনের নতুন প্রজন্মও মাতৃভূমি উদ্ধারে সোচ্চার রয়েছে এবং প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।  ইসরাইল নামক অবৈধ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শুধু ফিলিস্তিন নয় গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই দুঃখ-দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরাইল সৃষ্টির পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি ও অনিরাপত্তা জেকে বসেছে। ১৯৪৮ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অন্তত ১০টি যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। এসব যুদ্ধের মধ্যে ১৯৬৭, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালের যুদ্ধের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ফিলিস্তিন জবরদখলের দুই দশক পর ১৯৬৭ সালে ইহুদিবাদীরা আরব বিশ্বের ওপর ব্যাপকভিত্তিক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। এ সময় ইহুদিবাদী ইসরাইল জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, পূর্ব বায়তুল মোকাদ্দাস, সিরিয়ার গোলান মালভূমি ও মিশরের সিনাই মরুভূমি দখল করে নেয়। আরব ভূখণ্ড দখলের পর এসব এলাকায় ইহুদি উপশহর নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে। জমি দখলের পাশাপাশি  ফিলিস্তিনিদের অবশিষ্ট বসতিগুলোকে একে অপরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত করা হয়। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের শহর ও গ্রামগুলো পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনিদেরকে বিচ্ছিন্ন করতে ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকার মাঝখানে ইহুদি উপশহর নির্মাণ করা হয়েছে। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইহুদিদেরকে নিয়ে আসার প্রবণতা আরো বেড়ে যায় এবং ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে সেখানে ইহুদি অভিবাসীদেরকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে সব হারিয়ে শরণার্থীতে পরিণত হয় অগণিত ফিলিস্তিনি।

ইসরাইলের এ ধরনের অমানবিক তৎপরতার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ দুটি ইশতেহার প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের ইশতেহারে ১৯৬৭ সালে দখলীকৃত ভূখণ্ড থেকে সরে আসতে ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু ইসরাইল ওই দুই ইশতেহারকে কোন গুরুত্বই দেয়নি।  এখনও তারা পুরোদমে ইহুদি বসতি নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে।  এছাড়া ২০০২ সালে ইসরাইল ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দেয়াল নির্মাণ করেছে। এ দেয়ালের উচ্চতা ছয় মিটার। এটি বর্ণবাদী দেয়াল নামেও পরিচিত। এই দেয়ালের মাধ্যমেও ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের আরো একটা অংশ নতুনকরে দখলে নিয়েছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কোনো প্রতিবাদকেই গুরুত্ব দিচ্ছে না ইসরাইল। গাজার ওপর ইহুদিবাদীদের ৭ বছরের সর্বাত্মক অবরোধও এখনও অব্যাহত রয়েছে।

অবরোধের পাশাপাশি গাজার ওপর  মাঝে মধ্যেই ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে ইহুদিবাদীরা। বিশেষকরে ২০০৮ সালে ২২ দিন ও ২০১২ সালে ৮ দিনের ব্যাপক হামলায় গাজাজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। শাহাদাতবরণ করে বহু নিরপরাধ ফিলিস্তিনি। ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের মুখে ইহুদিবাদী সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হলেও কাপুরুষের মতো ফিলিস্তিনের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে তারা। পরমাণু অস্ত্র তৈরির মাধ্যমেও গোটা অঞ্চলকে হুমকির মুখে রেখেছে ইসরাইল। দিমুনা গ্রামে ইসরাইলের পরমাণু কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। অবৈধ রাষ্ট্রটি পরমাণু অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটিতে সই করেনি। তারা একের পর এক পরমাণু বোমার মজুদ গড়ে তুলছে। ইসরাইলের কাছে শত শত পরমাণু বোমা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরাইলের অপকর্ম এখন গোটা বিশ্বের কাছেই সুস্পষ্ট। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রথম দিকে যারা ইসরাইল প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন তারাই এখন এ কথা স্বীকার করছেন- ইসরাইল দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে এবং এটি ভেতর থেকেই ভেঙে পড়বে। যেসব ইহুদি ধোকায় পড়ে অন্য দেশ থেকে ইসরাইলে এসেছিল এখন তারা ইসরাইল ছাড়তে শুরু করেছে। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ইসরাইলি রাজনীতিবিদদের মাঝে নৈতিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক দুর্নীতি ইসরাইলের পতনের ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছে।

সম্প্রতি ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ বলেছেন, “ইসরাইল এখন অভ্যন্তরীণভাবে গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে এবং এই সংকট ইসরাইলকে ভেতর থেকেই পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।” তিনি বলেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চেকোস্লোভাকিয়া ও ইউগোস্লাভিয়াও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভঙুর হয়ে পড়েছিল। কারণ ভেতর থেকেই তাদের পচন ধরেছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলে গণঅসন্তোষ বেড়ে গেছে। মাঝে মধ্যেই  লাখ লাখ বঞ্চিত মানুষ রাজপথে মিছিলে অংশ নিচ্ছেন। এসব বিক্ষোভকারী বৈষম্য, দারিদ্র, ক্ষুধা, বেকারত্ব, আবাসন সংকট, নৈতিক স্খলন এবং পতিতাবৃত্তির বিরুদ্ধে শ্লোগান দিচ্ছে। এই সেই ইসরাইল যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইহুদিদেরকে সুখের স্বপ্ন দেখিয়ে আনা হয়েছিল। বলা হয়েছিল তাদের জন্য ভূস্বর্গ বানিয়ে দেয়া হবে। এসব ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদেরকে ইসরাইলে আনা হলেও এখন উল্টো চিত্রটিই চোখে পড়ছে। সামাজিক বৈষম্যের প্রতিবাদে এরইমধ্যে ১৪ জন বিক্ষোভকারী নিজের শরীরে নিজেই আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। ১৪ জন আত্মহত্যাকারীর প্রথম ব্যক্তি ছিলেন মুশে সালমান। শরীরে আগুন দেয়ার কয়েক দিন পর তিনি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে। তিনি নিজের শরীরে আগুন দেয়ার আগে এক বার্তায় বলেন, ইসরাইলি নেতারা হলো চোর। তারা মানুষের অর্থ-সম্পদ চুরি করেছে। সাধারণ মানুষের কথা তারা ভাবে না।

ওই আত্মহত্যার ঘটনার পর  বিপুল সংখ্যক মানুষ বিক্ষোভে নামে এবং তারাও মুশে সালমানের কথাগুলোর প্রতি সমর্থন জানায়। এ ধরনের নানা অভ্যন্তরীণ সংকট ইসরাইলি নেতাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এ ধরনের অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে মানুষের দৃষ্টিকে সরাতে তারা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নতুন যুদ্ধ ও সংকট তৈরির পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে। সিরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধও সে ধরনের ষড়যন্ত্রেরই একটি অংশ। এছাড়া, ইরানভীতি ছড়িয়ে দিয়ে অভ্যন্তরীণ সঙ্কটকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে ইসরাইল। ঘরে-বাইরে কোথাও ভালো নেই ইসরাইল। বিশেষকরে আমেরিকা নিজেই অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হওয়ায় ইসরাইলের প্রতি দেশটির অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। সব মিলিয়ে ইসরাইলি নেতারা এখন নিজেরাই তাদের অস্তিত্বের সংকটের বিষয়টি উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। তারা নিজেরাই স্বীকার করছেন যে, ইসরাইল ভেতর থেকেই ভেঙে পড়তে পারে। আর এমনটি হলে গোটা বিশ্বই মুক্তি পাবে বলে সচেতন মহল আশা করছে।#

সৌজন্যে: রেডিও তেহরান

শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০১৪

হিরোসিমা: ইতিহাসের আর্তনাদ, বর্তমানের অনুপ্রেরণা

আকতার হোসেন: মাত্র একটা বোমা যে কীভাবে মুহুর্তের মধ্যে একটি শহরকে গ্রাস করে ফেলতে পারে তা বিশ্ববাসীর কাছে ছিল অজানা। এর ভয়াবহতা যে কী পরিমান তা ছিল চিন্তার বাইরে। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকালের স্নিগ্ধতায়  মানুষ প্রত্যক্ষ করলো পৃথিবী জুড়ে ক্ষমতার লড়াইয়ের চুড়ান্ত বিভৎসতা। ক্ষমতার লড়াই কতটুকু হিংস্র আর অমানবিক হতে পারে।


একটি মাত্র আনবিক বোমা  যার নাম ‘লিটল বয়’। সেই লিটল বয়ের বিষাক্ত ছোবলে ক্ষত বিক্ষত হয় জাপানের হিরোশিমা নগরী। এর মাত্র তিনদিন পরে নিক্ষেপ করা হয় "ফ্যাটম্যান" নামক দ্বিতীয় আনবিক বোমাটি। এটি ফেলা হয় নাগাসাকি শহরের উপর।  সেই রক্তস্নাত শোকাহত স্মৃতি আজো বিশ্বব্যাপী স্মরন হয় শোক আর বেদনার অভিব্যক্তিতে। যুগে যুগে যুদ্ধ বিরোধী প্রচার এবং আন্দোলনে হিরোশিমার সেদিনের ভয়াল স্মৃতিকে তুলে ধরা হয় যুদ্ধকে ঘৃনা জানাতে।

কী ঘটেছিল সেই দিন?

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা তখন জোরেশোরে বাজছে। জাপানের হিরোশিমা শহরে স্থানীয় সময় সকাল আটটা ১৫ মিনিট। ভয়ংকর নির্দেশটা আগেই দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। বাকি ছিল শুধু বাস্তবায়ন। বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ বয়ে নিয়ে এল গণবিধ্বংসী সেই মারণাস্ত্র। হিরোশিমায় ফেলা হলো আণবিক বোমা ‘লিটল বয়’। মুহুর্তেই পুরে ছারখার হেয়ে যায় হিরোশিমা অঞ্চল। দেখে বুঝারই উপায় ছিলনাযে কয়েক মূহুর্ত আগেও এই শহরে মানুষ বসবাস করতো। কয়েক হাজার মানুষ সেদিন জীবন্ত পুড়ে মারা গিয়েছিল সেদিন। আনবিক বোমা হামলার সঙ্গে সঙ্গেই যে শুধু মানুষ মারা গেছে তা কিন্তু নয়৷ তেজস্ক্রিয়তা, শরীরের নানা অংশ পুড়ে যাওয়া এবং মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার কারণে ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ মোট মৃতের সংখ্যা গিয়ে ঠেকে ৬০ হাজারে৷ অন্যদিকে নাগাসাকিতে মারা যান প্রায় ৮০ হাজার লোক।  আনবিক বোমা হামলার ভয়াবহতা শুধু তখনই গ্রাস করেনি বিশ্ব বাসীকে। বরং মানব জাতিকে এর জের টানতে হয়েছে বছরের পর বছর। বোমা নিক্ষেপের দুই থেকে চার মাসের মধ্যে বোমার তীব্র প্রতিক্রিয়ায় মারা যান প্রায় ১ লক্ষ ৬৬ হাজার লোক। পাঁচ বছর পর তা গিয়ে দাঁড়ায় ২ লক্ষ ৩০ হাজারে! এটম বোমার বিষ্ফোরণ জাপানের পরিবেশকে করেছিল মারাতœক বিষাক্ত। মোট কথা বিপর্যয় নেমে আসে হিরোসিমায়।

ইতিহাসের পাতায় হিরোসিমা আক্রমণ:

হিরোশিমাতে যে সময় আনবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয় সে সময় শহরটি শিল্প ও সামরিক দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ববহন করছিল। হিরোশিমার কাছেই বেশ কিছু সেনা ছাউনি ও পঞ্চম ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার ছিল। শহরের মধ্যাঞ্চলে ছিল দালান ও হালকা ধরনের স্থাপনা। বাইরের দিকে ছিল ছোট ছোট কাঠের কারখানা ও জনবসতি। যুদ্ধের সময় হিরোশিমার জনসংখ্যা ৩ লক্ষ ৮১ হাজারে বৃদ্ধি পায়।
আনবিক বোমার পরে দ্রুত শহরটি খালি হয়ে যেতে থাকে। বোমা ছাড়াও এর অন্য একটি কারন সরকার কর্তৃক জনসাধারনকে শহর থেকে সরিয়ে নেয়া।

৬ই অগাষ্টের আনবিক বোমা নিক্ষেপের জন্য নির্বাচিত তিনটি শহরের একটি হচ্ছে হিরোশিমা। অন্য দুটি হচ্ছে কোকুরা ও নাগাসাকি। ৩৯৩ বোম্বার্ডমেন্ট স্কোয়াড্রনের অন্তর্ভুক্ত ছিল বি-২৯ এনোলা বে বিমানটি। যার চালক ও কমান্ডার ছিলেন ৫০৯তম কম্পোজিট গ্রুপ কমান্ডার কর্নেল পাউল টিব্বেটস। এনোলা গে উড্ডয়ন করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় টিনিয়ান এয়ারবেস থেকে। জাপান পর্যন্ত উড়ে যাবার সময় হলো ছয় ঘন্টা।

পাইলট পাউল টিব্বেটস এর মায়ের নাম অনুসারে বিমানটির নাম দেয়া হয় এনোলা গে।

টিনিয়ান বেস থেকে উড়ে যখন টার্গেট অঞ্চলে পৌঁছায় তখন দৃষ্টিসীমা ছিল ৯ হাজার ৮৫৫ মিটার। বোমা নিক্ষেপের প্রায় একঘন্টা আগে জাপানের রাডার মার্কিন বিমানের আগমনী বার্তা সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। বিমান হামলার সতর্কবাণী রেডিওতে প্রচার করা হয়। হিরোশিমা সহ অনেক শহরে রেডিও সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। সকাল ৮ টার দিকে হিরোশিমার রাডার অপারেটর মোট কয়টি আমেরিকান বিমান আসছে তা চিহ্নিত করেন। দেখা যায় বড়জোর তিনটি মার্কিন বিমান আসছে, কাজেই বিমান হামলার তেমন সম্ভাবনা নেই মনে করে বিমান হামলার সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। এ দিকে জাপানী বিমানবাহিনীও তেল ও বিমান বাঁচাতে এই তিনটি মাত্র বিমানকে প্রতিহত করার চিন্তা বাদ দেয়।

হিরোশিমা সময় সকল ৮.১৫ মিনিটে পরিকল্পনা মাফিক ৬০ কিলোগ্রাম ওজনের ইউরেনিয়াম-২৩৫ সমৃদ্ধ লিটল বয় বিমান থেকে পড়ে। ৪৩ সেকেন্ড সময় নেয় শহরের ৫৮০ মিটার বা ১৯০০ ফুট উচ্চতায় আসতে। বোমা নিক্ষেপ করে ১১.৫ মাইল চলে আসার পর নিক্ষেপকারী বিমানটি বোমার শক ওয়েভ অনুভব করতে পারে।

সে সময় জোর বাতাস বইছিল, ফলে বোমাটি তার ঠিক লক্ষ্য আওই ব্রিজে পৌঁছাতে ব্যার্থ হয় এবং ২৪০ মিটার পাশে সরে গিয়ে শিমা সার্জিক্যাল ক্লিনিকের উপর বিস্ফোরিত হয়। ১৩ কিলোটন টিএনটির সমপরিমান বিস্ফোরন ঘটে। প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। জাপানের প্রদত্ত হিসেবে মতে হিরোশিমার ৬৯% ভাগ দালান পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়।

সাথে সাথেই নিহত হয় প্রায় ৮০ হাজার মানুষ, আরো ৭০ হাজার পরবর্তী কিছুদিনের মধ্যে মারা যান। হিরোশিমা শহরের ৯০% ডাক্তার, ৯৩% নার্স বোমায় নিহত হন। ১৯৫০ সালের মধ্যে আনবিক বোমায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লক্ষে। ক্যান্সার সহ নানান প্রতিক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়।

হিরোশিমার বর্তমান অবস্থা


১৯৪৯ সালে হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি পার্ক নির্মান করা হয়, হিরোশিমা চৎবভবপঃঁৎধষ শিল্প উন্নয়ন হল, পষড়ংবংঃ বোমা বিস্ফোরণ এর স্থানে জীবিত ভবন, এবহনধশঁ অট্টালিকা বা পরমাণু অট্টালিকা , হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি জাদুঘর ১৯৫৫ সালে নির্মান হয়।







হিরোশিমা ১৯৪৯ সালে জাপানি পার্লামেন্ট দ্বারা শান্তি শহরের ঘোষিত হয়। হিরোশিমা উপসাগরকে ঝিনুকের আঁধার বলা হয়। সরকার আর জনগনের চেষ্টায় এই শহর এখন হয়ে শান্তি আর উন্নয়নের নগরী। একটি বিধ্বস্ত দেশ থেকে কীভাবে উন্নয়নের নগরীতে পরিণত হওয়া যায়, বর্তমান হিরোসিমা তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। তাই বর্তমান হিরোসিমা এখন বিশ্বের অনুপ্রেরণা।

রবিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৪

জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘গরু সমিতি’


নারায়ণগঞ্জ, ২৭ জুলাই : “আমরা গরীব মানুষ। ঈদে পোলাপানগো জামা কাপড় দিতেই সব টেকা শেষ। কোন মতে সেমাই- চিনি কিনছি। মাংস কেনার টাকা পাবো কোথায়? কিন্তু সমিতি কইরা এইবার চার কেজি গরুর মাংস আনছি।” এ কথাগুলো বললেন আড়াইহাজার পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের ফৈটাদী নাগরাপাড়া গ্রামের দিনমজুর আব্বাস আলী মিয়া।

একই গ্রামের আনোয়ার হোসেন, আল আমীন ও জাকির হোসেন জানান, মাংস সমিতি করে তারা অনেক লাভবান হতে পেরেছেন। সমিতি করলে নিজেরা গরু কিনে এনে ভাল মাংস পাওয়া যায়। তাছাড়া খরচও কম পড়ে।

বেশ কয়েক বছর ধরে নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘মাংস সমিতি’ বা ‘গরু সমিতি’। উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ১০ টি ইউনিয়নে এ বছর ৫’শ এর ও বেশি সমিতি গরীব , নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের মাংসের চাহিদা পুরণ করেছে। সারাবছর একটু একটু করে সঞ্চয় করে ঈদের আগে পশু কিনে জবাই করে মাংস ভাগ করে নেন ‘মাংস সমিতি’র সদস্যরা। এতে করে ঈদে গরীব মানুষ বাড়তি আনন্দ পায় এবং তাদের আর্থিক চাপও কমে যায়।

আড়াইহাজার উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, পাড়া বা মহল্লায় ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এ ধরনের মাংস বা গরু সমিতি গঠন করা হয়। শুরুতে শুধুমাত্র নিম্নবিত্ত মানুষেরা এ ধরনের সমিতি করলেও এখন মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তরা ও মাংস সমিতি করছেন। মাংস সমিতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গ্রামের লোকজনের সাথে আলাপ করে জানাযায়, দশ-বারো বছর আগে দু’একটি গ্রামে পেশাদার মাংস বিক্রেতারা পরীক্ষা মূলকভাবে এ ধরনের সমিতি চালু করেছিল। কসাইদের দেখানো পথে অনেকেই হেটেছেন। প্রতিবছর বাড়ছে মাংস সমিতির সংখ্যা।

এ বছর আড়াইহাজারের উপজেলার ৩১৬ টি গ্রামে সমিতির সংখ্যা ৫’শ এরও বেশি হয়েছে বলে জানাগেছে। মাংস সমিতিতে সচরাচর সদস্য সংখ্যা হয়ে থাকে ২০ থেকে ৪০ জন পর্যন্ত। প্রত্যেক সদস্য সপ্তাহে বা মাসে চাঁদা জমা দেন। ঈদুল ফিতরের দু’একদিন আগে জমা করা টাকায় গরু বা ছাগল কিনে এনে জবাই করে সদস্যরা মাংস ভাগ করে নেন। তবে চামড়া বিক্রির টাকা পরের বছরের জন্য তহবিল গঠন করে সমিতির কার্য্যক্রম চলে।

আড়াইহাজার পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের নাগড়াপাড়া ফৈটাদী গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো: আব্বাস মিয়া, আনোয়ার হোসেন ও আল আমিন একটি মাংস সমিতি গঠন করেছিলেন। মূল উদ্যোক্তা আব্বাস মিয়া জানান, তাদের সমিতিতে সদস্য সংখ্যা ছিল ২৫ জন। প্রত্যেকে সপ্তাহে টাকা জমা দিতেন। বছর ঘুরে সমিতিতে জমা হয় ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে গরু কিনে এনে সমিতির সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। প্রত্যেকের ভাগে ৫ কেজি করে মাংস পড়েছে। তাদের এলাকাতেই এ ধরনের অšতত ৬ টি সমিতি রয়েছে।

শনিবার, ২৬ জুলাই, ২০১৪

শেষ মুহূর্তের ঈদ বাজার: বেচাকেনায় ভাটা, ব্যবসায়ীরা হতাশ


আকতার হোসেন: ঈদের আর মাত্র কয়েকটি দিন বাকী। ভীড় বাড়তে শুরু করেছে নগরীর বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনাল গুলোতে। ফাঁকা হতে শুরু করেছে রাজধানী। সেই সাথে তুলনামুলক ভাবে রাজধানীর বিপনী বিতান গুলোতেও ভীড়ও কমছে। সাধারণত রমজানের শুরু থেকে বেচাকেনার পরিমান বাড়তে থাকে। আর শেষ মুহূর্তে বিশেষ করে চাঁদরাত পর্যন্ত বেচাকেনার পরিমান বেড়ে যায় কয়েকগুন। ব্যাবসায়ীদের যেন দম ফেলার সময় থাকেনা। কিন্তু এবারের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন।

শুরুতে ক্রেতা কম থাকলেও ঈদ এগিয়ে আসার  সাথে সাথে ভীড় বাড়তে থাকে। ব্যাবসায়ীরাও আশায় বুক বাঁধতে থাকে। সেই সাথে তারা দোকনগুলোতে কয়েকগুন বেশি পন্য বোঝাই করেন। সবার প্রত্যাশা শেষ মূহুর্তে বেচাকেনা আরও বাড়বে।

কিন্তু সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটি নিয়ে বড় রকমের ছুটির ফাঁদে পড়ে দেশ। কর্মজীবীরা নিজেদের সুবিধা মতো ছুটি নিয়ে অনেকেই ছুটছেন আপনজনদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। আর যারা এখনও যেতে পারেননি তারাও ঢাকা ত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেকে আবার আগে ভাগে পরিবারের সদস্যদের পাঠিয়ে দিয়েছেন গ্রামে।

ফলে রাজধানী কার্যত ফাঁকা হয়ে পড়ায় এর প্রভাব পড়েছে শপিংমল গুলোতে। বিকি-কিনি ধারাবাহিকভাবে চললেও ব্যবসায়ীরা বলছে সময়ের তুলনায় ক্রেতা সমাগম হতাশাজনক। এমনকি ফুটপাতেও এবার বেচাকেনা অনেক কম।

নগরীর বিভিন্ন শপিংমল ও ফুটপাত ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। ব্যাবসায়ীদের হিসাবে ২৭ রমজানের পর থেকে কাস্টমার আসবে জোয়ারের মতো। বেচা কেনার ধুম লেগে যাবে। দম ফেলারও সময় পাবেননা তারা। অথচ এবার রমজান উপলক্ষে বাড়তি সেলসম্যানরা কাজ করছেন ঢিলেঢাল ভাবে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ীরা ক্রেতা আকর্ষন করতে হাক ডাক ছাড়ছেন। একজন কাষ্টমার পেলে নিজেদের দোকানে ভেড়াতে উঠে পড়ে লাগছেন। কথা হয় রাজধানীর ফকিরের পুল এলাকার ফুটপাতের এক ব্যাবসায়ীর সাথে। বেচাকেমন কেমন- এ প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, দেখতেই তো পারছেন কেমন বেচা কেনা হচ্ছে। কাস্টমরাই নাই। বেচমু কার কাছে। রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখলে মনে হয় দেশে হরতাল লাগছে। এমতাবস্থায় ঈদের জন্য সংগ্রহ করা তার সব পণ্য যথা সময়ে বিক্রি করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে ব্যাপক চিন্তিত তিনি।

রাজধানীর পান্থপথে অবস্থিত দেশের সর্বাধুনিক শপিং মল বসুন্ধরা সিটিতে গিয়ে দেখা গেল বেশিরভাগ দোকানি  বসে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন। এ দোকানগুলো মূলত  মহিলাদের শাড়ী, পাঞ্জাবী, আর ফতুয়ার দোকান।
 মোটামুটি ক্রেতাদের ছোট-খাটো ভিড় দেখা গেলেও বেশিরভাগ ক্রেতারা শুধু এ দোকান ও দোকান ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাছাড়া এই সময়ের তুলনায় সেই সংখ্যাটাও নেহাতেই নগন্য।

ঈদের বেচা -কেনা কেমন হচ্ছে এ বিষয়ে কথা বলতেই করিম উদ্দিন নামের একজন বিক্রেতা চরম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, সারা বছর তো ব্যবসা এমনিতেই হয় না। তাই আশায় থাকি অন্তত ঈদের সময় দারুণ একটা ব্যবসা করার জন্য। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি।

বিক্রেতা করিম অভিযোগের আঙ্গুল সরকারের দিকে দেখিয়ে বলেন, এ সরকার যতদিন থাকবে ব্যবসা করে আমরা কোন সুবিধা করতে পারবো না। তিনি বলেন, গত বছর আমাদের এক সপ্তাহে যা বিক্রি হয়েছিল এ বছর পুরো মাসেই তার অর্ধেক ব্যবসাও হয়নি। এভাবে একটি ব্যবসা চলতে পারেনা। তাই এ রকম বেচা-কেনার মুহূর্তেও  চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি।

ঈদের বেচাকেনা নিয়ে কথা বলতেই মৌচাক এলাকার এক ব্যাবসায়ী ওই দিনের একটি জাতীয় দৈনিকের একটি নিউজ  দেখিয়ে বলেন, ভাই দেশে ডিজিটাল রাজত্ব চলছে তাই কোন কথা বলতে পারবোনা। দেশের পরিস্থিতি বেশি ভালোনা। তাহলে আমরা ভালো থাকবো কেমন করে? মানুষের হাতে টাকা পয়সা নাই, তাই ব্যাবসায়ও মন্দা।

ব্যাবসায়ীরা জানান, এমনিতেই সারা বছর বেচাকেনা অনেক কম হয়। দোকান ভাড়া, কর্মচারী খরচ, বিদ্যুৎ বিল, আনুষঙ্গিক খরচসহ বিনিয়োগকৃত টাকা তুলে আনা সর্বোপরি সারা বছরের সেই আয় দিয়ে টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়ে। তাই ব্যাবসায়ীরা মুখিয়ে থাকে এই এক মাসের জন্য। এক মাসেই পুষিয়ে নিতে চায় বছরের সব ঘাটতি। কিন্তু এবার আগে আগে মানুষ ঢাকা ত্যাগ করতে শুরু করায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে তাদের। তাদের শঙ্কা বাড়ছে অতিরিক্ত দামে ক্রয় করা অতিরিক্ত মাল চাঁদ রাতের মধ্যে বিক্রি করতে পারবেনতো!

ব্যাবসাীরা জানান, গত বছরও দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেনি ব্যাবসায়ীরা। তবে এবারের চিত্র ছিল অনেকটাই স্থিতিশীল। রাজনৈতিক দলগুলো কঠোর কোন কর্মসূচিও ছিলনা। তাই এবার ব্যাবসায়ীদের চাহিদাটাও ছিল একটু বেশী। তারা আশা করেছিল দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুকুল থাকলে গতবারের চেয়ে অনেক বেশি বিকিকিনি হবে।

কিন্তু এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়েও খুশি হতে পারছেননা তারা। ব্যবসায় এমন বাজে অবস্থা যে ব্যবসায়ীরা এখন হাসির বদলে চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছে। তবুও অনেকেই এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন যে, পরিস্থিতি যাই হোক আল্লাহর রহমতে চাঁদ রাত পর্যন্ত বেঁচাকেনা বেশ ভালো হবে।

বুধবার, ২৩ জুলাই, ২০১৪

হিটলার ইহুদীদের প্রতি এত ক্ষিপ্ত ছিলেন কেন? পর্ব-১


অ্যাডলফ হিটলার। অবশ্য শুধু হিটলার হিসেবেই বিশ্বব্যাপী অধিক পরিচিত তিনি। ইতিহাসের পাতায় এক নিষ্ঠুর শাসক ও ভয়ানক খুনি হিসেবেই তার কুখ্যাতি। তবে, হিটলারের হিটলিস্টে যারা পরপারে যাত্রা করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল ইহুদী সম্প্রদায়ের লোকেরা।

গত অর্ধশতাব্দিরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনের শান্ত ভূমিতে অশান্তির দাবানল সৃষ্টিকারী এবং অসংখ্য নারী-পুরুষ ও মাসুম শিশুর রক্তে যাদের হাত রঞ্জিত সেই ইহুদীদের প্রতি হিটলার কেন এত বিরাগভাজন ছিলেন? কেন লাখ লাখ ইহুদীকে নির্মমভাবে হত্যার পর তিনি আবার সদর্পে ঘোষণা দিয়েছিলেন-আমি ইচ্ছা করলে সব ইহুদীদের হত্যা করতে পারতাম, কিন্তু কিছু ইহুদী রেখে দিলাম যাতে পরবর্তী প্রজন্ম বুঝতে পারে কেন আমি তাদের হত্যা করেছিলাম।

হিটলারের এই ধরনের দম্ভোক্তি হয়তো এতদিন মানুষের কাছে তার হিংস্রতারই বহি:প্রকাশ হিসেবেই প্রতিভাত হতো। কিন্তু গত কয়েক দশকে যায়নবাদী ইসরাইলিরা ইহুদীবাদ সম্প্রসারের নামে যেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও তান্ডবের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে, তাতে অনেকেই এখন আগ্রহী হয়ে উঠেছেন হিটলারের ইহুদী বিদ্বেষের আদ্যপান্ত জানতে। খলনায়ক থেকে হিটলারকে অনেকেই এখন মহানায়ক ভাবতে শুরু করেছেন।

ইহুদীদের মতো এমন একটি বর্বর জাতিকে যেই মহামানব ধ্বংস করে পৃথিবীকে অশান্তির হাত থেকে উদ্ধার করেছিলেন সে আর যাই হোক অতটা খারাপ নয়-এমন ধারনাও এখনকার প্রজন্মের অনেকেই পোষণ করে থাকেন।

যাই হোক আজকের আলোচনার বিষয় এটি নয়। এই বিতর্কিত বিষয় নিয়ে গবেষণা চলতে থাকুক। হয়তো একদিন আসল সত্য প্রকাশ পাবে। কারণ ইতিহাস কখনো চাপা থাকে না। কোন না কোনভাবে আসল সত্য এক সময় প্রকাশ করাই ইতিহাসের ধর্ম।

এবার মূল আলোচনায় আসা যাক। আর সেটি হলো হিটলার ইহুদীদের সম্পর্কে আসলে কী বলে গেছেন? ইহুদীদের প্রতি তিনি কেন এত ক্ষিপ্ত ছিলেন? এত বিশাল সংখ্যক ইহুদীকে হত্যা করার পরও সামান্যতম অনুশোচনায় না ভুগে কেন হিটলার তার এই কাজকে বরং ইতিবাচক হিসেবে প্রচার করেছেন?

১৯২৪ সালে মিউনিখ গণআদালতে বিচার চলাকালে লেখ নদীর তীরবর্তী ল্যান্ডসবার্গের দুর্গে হিটলারের কারাজীবন শুরু হলে সেখানেই তিনি লিখেছিলেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ "মাইন ক্যাম্পফ" (Mein Kampf)। এই বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় তিনি ইহুদীদের সম্পর্কে যেসব কথা বলেছেন সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে সাজিয়েই টাইমনিউজবিডির পাঠকদের জন্য তৈরি করা হলো এই ধারাবাহিক প্রতিবেদন। জার্মান ভাষায় লিখিত হিটলারের মাইন ক্যাম্পফ বইটির ইংরেজী অনুবাদ করেছেন জেমস মারফি।

ইহুদীদের প্রতি হিটলারের মনে যে প্রচন্ড ঘৃনা ও বিদ্বেষের জন্ম হয়েছিল তা কোন ধরনের উগ্র চিন্তা বা অন্যায়বোধ থেকে জন্মলাভ করেনি বলেও বইয়ের বিভিন্ন স্থানে যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন হিটলার। তিনি ইতিহাস সম্পর্কে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। ছোটবেলা থেকেই ইতিহাস পাঠ করে এবং সচেতনভাবে ইহুদীদের কুটকৌশল দেখতে দেখতে বিবেকের তাড়না থেকেই ইহুদীদের দমনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছিলেন হিটলার।

হিটলার তার বইয়ের একেবারে প্রথম দিকে “In the Home of My Parents” অর্থাৎ “বাবা-মায়ের সঙ্গে বাড়ির দিনগুলো”-এমন শীরোনামের অধ্যায়ে লিখেছেন “To study the history means to search for and discover the forces that are the causes of those results which appear before our eyes as historical events. The art of reading and studying consists in remembering the essentials and forgetting what is not essentials”.

অনুবাদ করলে এর মর্মার্থ দাঁড়ায়-“ইতিহাস অধ্যয়নের প্রকৃত অর্থ হলো ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা হিসেবে আমাদের চোখের সামনে যেসব ঘটনা আসে সেগুলোর পেছনের মূল শক্তিকে খুঁজে বের করা এবং এর কারণ ও ফলাফল আবিস্কার করা। পাশাপাশি ইতিহাস পাঠের সর্বোত্তম কৌশল হলো প্রয়োজনীয় বিষয়টাকে মনে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয়টাকে ভুলে যাওয়া”।

শুধু ইতিহাসই নয় জীবনের প্রতিটি বাঁক সম্পর্কেও হিটলারের উপলব্ধি ছিল অসাধারণ। সেই ছোট বেলা থেকেই হিটলার জীবনকে একেবারে নিজের মতো করে উপলব্ধি করার চেষ্টা করতেন। কারো চাপিয়ে দেয়া কিছু তিনি সহজে মেনে নিতে পারতেন না যদি না সেটি তার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হতো।

আর এ কারণেই মাত্র এগারো বছর বয়সেই তিনি নিজের বাবার মতের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু এটা আলোচনার বিষয় না হওয়ায় এ ব্যাপারে বেশি আলোচনা না করে শুধু হিটলারের একটি উক্তি তুলে ধরা যাক। বইয়ের একই অধ্যায়ের শেষের দিকে হিটলার লিখেছেন, “I respected my father but I loved my mother” অর্থাৎ “বাবাকে শ্রদ্ধা করতাম, কিন্তু মাকে ভালোবাসতাম”।

এ অধ্যায়ে হিটলার আরও লিখেছেন, “For the first time in my life- I was then eleven years old- I felt myself forced into open opposition. No matter how hard and determined my father might be about putting his own plans and opinions into action, his own son was no less obstinate in refusing to accept ideas on which he set little or no value.”

সরল অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, “আমার মধ্যেও প্রচন্ড জেদ। জীবনে প্রথমবারের মতো বাবার মতামতকে অগ্রাহ্য করলাম সেই ১১ বছর বয়সে। ভয় অথবা স্নেহ কোন কিছুই আমাকে বিচ্যুত করতে পারলো না আমার সিদ্ধান্ত থেকে”।

“Years of Study and Sufferings in Vienna” অর্থাৎ “অধ্যয়ন ও ভিয়েনায় যন্ত্রনাময় বছরগুলো”-এই শিরোনামে বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে হিটলার তৎকালীন সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে লিখেছেন, “Here there is no place for merely social activities and that there can be no expectation of gratitude; for in this connection there is no question at all of distributing favors but essentially a matter of retributive justice”.

অর্থাৎ “সামাজিক কর্মকান্ড বলতে যা বুঝায় তার কোন স্থান সেখানে ছিল না এবং কৃতজ্ঞতা নামক বিষয়টি সমাজের বুক থেকে মুছে গিয়েছিল। সমাজের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশা করাটাই ছিল বৃথা। সত্যিকার অর্থে প্রাপ্য যদি কিছু থাকে, তা ছিল অন্যায় বিচার”।

বইয়ের একই অধ্যায়ে হিটলার আরও লিখেছেন, “At that time it was for the most part not very difficult to find work, because I had to seek work not as a skilled tradesman but as a so-called extra-hand ready to take any job that turned up by chance, just for the sake of earning my daily bread…filled more and more with the idea that honest work never disgraced anybody, mo matter what kind it may be.”

অর্থাৎ “সে দিনগুলোতে আমার পক্ষে কাজ যোগাড় করা কঠিন হলেও অসম্ভব ছিল না। কারণ দক্ষ শ্রমিকরা যে কাজ করেন সেই কাজই আমাকে যোগাড় করতে হবে এমন কোন কথা নেই। বরং কুলি-কামারের মতো কাজ, যেগুলোতে অনেকেরই আগ্রহ নেই, পেটের তাগিদে আমি সেগুলোই করতাম...কোন কাজ কাউকে ছোট করতে পারে না, যদি তা সততার সাথে সম্পন্ন করা যায়”।

এভাবেই জীবনের প্রতিটি বাঁকে নিজস্ব উপলব্ধি আর ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করে বাস্তব সত্য অনুধাবন থেকেই হিটলারের ইহুদী বিদ্বেষের জন্ম। আর এটা যে কতটা বাস্তব ছিল তা বর্তমান সময়ের প্রতিটি সচেতন মানুষ স্বচক্ষে দেখে উপলব্ধি করতে পারছেন।

তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইপ এরদোগান বলেছেন, ইসরায়েল জার্মানির নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের চেয়েও বর্বর। শনিবার (১৯ জুলাই ২০১৪) তুরস্কে এক নির্বাচনী সমাবেশে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

বাবা মা দুজনকেই হারিয়ে চরম দারিদ্রের মধ্যে যখন হিটলারের দিনগুলো কাটছিল, তখনও তার উপলব্ধিতে এতটুকু ঘাটতি হয়নি। বরং ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দেশ-জাতির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে উপলব্ধিটা যেন আরও শানিত হচ্ছিল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে হিটলারের সেই সময়কার অনুভূতি তিনি ব্যক্ত করেছেন তার বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে।

“Years of Study and Sufferings in Vienna” অর্থাৎ অধ্যয়ন ও ভিয়েনায় যন্ত্রনাময় বছরগুলো”-এই শিরোনামে হিটলার আরও লিখেছেন “It was during this period that my eyes were opened to two perils, the names of which I scarcely knew hitherto and had no notion whatsoever of their terrible significance for the existence of the German people. These two perils were Marxism and Judaism”.

সরল অনুবাদ করলে দাঁড়ায়-“এ সময় জার্মান জাতির জন্য হুমকিস্বরুপ দুটো বিষয় আমার দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। এর মধ্যে একটি হলো মার্কসইজম এবং অন্যটি হলো জুডোইজম বা ইহুদীবাদ”।

বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় তিনি মার্কসইজমের নানা অসঙ্গতি অত্যন্ত বাস্তবিকভাবে তুলে ধরেছেন। চলমান সমাজের নানা ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে পেশ করে তার সাথে ইতিহাসের যোগাযোগ স্থাপন করে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তিনি মার্কসবাদের নেতিবাচক দিকগুলো দেখিয়ে দিয়েছেন। তবে এই প্রতিবেদন যেহেতু ইহুদীদের প্রতি হিটলারের দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে। তাই মার্কসইজম বিষয়ে হিটলারের মনোভাবের বিষয়টি আলোচনা করার অবকাশ নেই।

হিটলার তার বইয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে ইহুদীরা সুকৌশলে মানুষকে যুগের পর যুগ ধোকা দিয়েছে। কিভাবে যায়নবাদী ইসরাইলিরা হলুদ সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে মানুষকে প্রকৃত সত্য থেকে বিমুখ রেখেছে এবং মিথ্যার বেসাতি দিয়ে কিভাবে পুরো বিশ্ববাসীকে নাস্তানাবুদ করেছে। বইয়ের বিভিন্ন স্থানে হিটলারের ইহুদীদের নিয়ে লেখা এমন তথ্যগুলোই পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হবে এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনে। ধারাবাহিকের প্রথম পর্বের এখানি সমাপ্তি টানা হলো। (-কামরুজ্জামান বাবলু )

বুধবার, ১৬ জুলাই, ২০১৪

জমে উঠতে শুরু করেছে রাজধানীর ঈদ বাজার

আকতার হোসেন : একে একে ফুরিয়ে আসছে রমজানের  দিন গুলো। সে সাথে হাতছানি দিয়ে ডাকছে মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ঊৎসব ঈদ-উল ফিতর। ঈদকে কেন্দ্র করে জমে  উঠতে শুরু করেছে রাজধানীর শপিং মলগুলো। ক্রেতা-দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠছে মার্কেটগুলো। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে বেচাকেনা। সারা বছরের মন্দাভাব কাটিয়ে উঠে বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যাবসায়ীরাও তাই নেমেছেন আটঘাট বেঁধে। সে লক্ষ্যে রমজানের শুরু থেকেই তারা বিপুল পরিমান পণ্যসামগ্রী সংগ্রহ করেছেন। রাজধানীর বিভিন্ন শপিংমল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ব্যাবসায়ীরা নান্দানিক ডেকোরেশন ও আলোকসজ্জার মাধ্যমে নতুন করে সাজিয়ে তুলেছে তাদের পণ্যে ঠাসা দোকানগুলো। রমজানের শুরুতে ক্রেতা কম থাকায় কিছুটা হতাশা কাজ করলেও ঈদ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে তা কাটিয়ে উঠছে তারা। ব্যাবসাীরা আশা করছেন, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুকুল থাকলে গতবারের চেয়ে অনেক বেশি বিকিকিনি হবে। গত বছরও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দেশের অবস্থা খারাপ থাকার কারণে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেনি ব্যাবসায়ীরা। তবে এবারের চিত্র অনেকটাই স্থিতিশীল। তাই এবার ব্যাবসায়ীদের চাহিদাও একটু বেশী।

রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, সকালের দিকে ক্রেতা সমাগম কিছুটা কম থাকলেও বিকালের দিকে তা কয়েকগুন বৃদ্ধি পায়। বেচাকেনা চলছে টানা রাত দশটা পর্যন্ত। বাতিল করা হয়েছে দোকানকর্মচারীদের ছুটি। বন্ধের দিনেও খোলা থাকছে মার্কেটগুলো। সামনের দিনগুলোতে গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খোলা থাকবে বলে জানান ব্যাবসায়ীরা।

ব্যাবসায়ীরা জানান, এমনিতেই সারা বছর বেচাকেনা অনেক কম হয়। সারা বছরের সেই আয় দিয়ে টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়ে। তাছাড়া দোকান ভাড়া, কর্মচারী খরচ, বিদ্যুৎ বিল, আনুষঙ্গিক খরচসহ বিনিয়োগকৃত টাকা তুলে আনা সবগুলোই বেশ চ্যালেঞ্জের । তাই ব্যাবসায়ীরা মুখিয়ে থাকে এ এক মাসের জন্য। ব্যবসায়ীদের ভাষায় রমজান ও ঈদকে বলা হয় সিজন টাইম। এই সিজনেই পুষিয়ে নিতে চায় বছরের সব ঘাটতি। এ সময়ে মানুষজন প্রায় প্রত্যেকেই নিজেদের জন্য ও আপনজনের জন্য কিছুনা কিছু কেনার চেষ্টা করেন। এতে ব্যাবসায়ীদের বেচা-বিক্রিও বেশ ভাল হয়।

বাহারী পোশাকে ঠাসা দোকানগুলো
ঈদকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন ডিজাইনের বাহারীসব পোশাকে ঠাসা রাজধানীর শপিংমলগুলো। ফ্যাশন হাউজগুলো তাদের নিজস্ব ডিজাইনের পোশাক নিয়ে এসেছে বাজারে। আর অন্যান্য সাধারণ দোকানীরা ক্রেতা চাহিদা লক্ষ্য রেখে বিভিন্ন ধরণের পোশাকের সমাহার ঘটিয়েছে। রাজধানীর মৌচাক, মালিবাগ, শান্তিনগর, মগবাজার, পলওয়েল, গুলিস্তান, পল্টন, পীর ইয়ামেনীসহ বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে প্রায় প্রত্যেকটি দোকানেই স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুন বেশি পোশাক সংগ্রহ করে রেখেছে ব্যাবসায়ীরা। বাজার ঘুুরে দেখা গেছে এবার ছেলেদের বিভিন্ন স্টাইলের জিন্স, টিস্যু, গ্যাভাডিনসহ ফরমাল প্যান্টের চাহিদা বেশি। এছাড়া অত্যাধুনিক ও মনকাড়া দেশীয় ডিজাইনের শার্ট, পাঞ্জাবী,ফতুয়া বিক্রি হচ্ছে বেশী।

অন্যদিকে মেয়েদের পোশাকের মধ্যে ফুল হাতা লং কামিজ, আনস্টিচ থ্রি পিস, লেহেঙ্গা, শাড়ির মধ্যে জামদানী, কাতান ইত্যাদির চাহিদা তুঙ্গে। তাছাড়া প্রতিবারের ন্যায় এবারও মেয়েদের ঈদ বাজারে দাপটের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে পার্শ্ববর্তী দেশ ও হিন্দী সিরিয়ালের বিভিন্ন চরিত্রের নামকরণ অনুযায়ী ডিজাইন করা পোশাকগুলো।

বিক্রি বেশি ছোটদের পোশাক, ভীড় বেশি কসমেটিক্সের দোকানে
রাজধানীর শপিংমলগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ঈদঘনিয়ে আসার সাথে সাথে মার্কেটগুলোতে ভীড় বাড়লেও বেচা-বিক্রি তুলনামুলক কম। তবে ছোটদের পোশাক ও জুতা বেশি বিক্রি হচ্ছে। এব্যাপারে মৌচাক মার্কেটের এক দোকানী জাস্ট নিউজকে জানান,  ঈদে সাধারণত ছোটদের আনন্দটাই থাকে আলাদা। শপিং নিয়ে ছোট বাচ্চাদের আবদার থাকে শক্তিশালী। তাছাড়া সব বাবা-মা ই নিজেদের চেয়ে সন্তানের পছন্দটাকে গুরুত্ব দেয় বেশি। সেজন্য সবাই বাচ্চাদের শপিংগুলোই আগে ভাগে সেরে নেয়।  অন্যদিকে মার্কেটগুলোতে মহিলাদের নানারকম প্রসাধনী, ব্যাগ ও চুড়িসহ বিভিন্ন দোকানে ভীড় তুলনামুলক বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
এছাড়া রেডিমেড পোশাকের পাশাপাশি থান কাপড়ের দোকানেও বেচা-বিক্রি কম নেই। বিক্রেতারা জানান, অনেকে  রেডিমেড পোশাকের চেয়ে অর্ডার দিয়ে পোশাক তৈরি করে নিতে পছন্দ করেন।  আর  ঈদের সময় সাধারণত ১৫ রমজানের পর থেকেই দর্জি বা টেইলার্সের দোকানে আর অর্ডার নিতে চায়না। সেজন্য আগে ভাগে রেডিমেড পোশাকের চেয়ে কাটা বা গজ কাপড়েরর দোকানগুলোতে তুলনামুলক বেচা-বিক্রি বেশি।

তবে এ মুহূর্তে বেচা-বিক্রি যাই হোক দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো থাকলে গতবারের চেয়ে এবার ঈদে অনেক ভালো বিক্রি হবে এমনটাই আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

সোমবার, ১৪ জুলাই, ২০১৪

ফিতরা কী, কেন? এবছর জনপ্রতি ফিতরা ৬৫ টাকা


এবার সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে জনপ্রতি ৬৫ টাকা। গম বা আটার বাজারমূল্য হিসাব করে ফিতরা নির্ধারণ করা হয়। সোমবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনের সভাপতিত্বে ফিতরা নির্ধারণী সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় ফিতর নির্ধারণী কমিটির সদস্য ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।

জানা যায়, গম বা আটা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম অথবা খেঁজুর, কিসমিস বা পনির যে কোনো একটি পণ্যের ৩ কেজি ৩০০ গ্রামের বাজার মূল্য ফিতরা হিসেবে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা যায়। এ সব পণ্যের বাজার মূল্য হিসাব করে এবার ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বনিম্ন ৬৫ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা।

ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। নাবালক ছেলেমেয়ের পক্ষ থেকে বাবাকে এই ফিতরা দিতে হয়। আর তা দিতে হয় ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই।

ফিতরা কী এবং কেন?
পবিত্র রমজান মাসে বিশেষ কিছু আমল আমাদের জন্য রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সাদকাতুল ফিতর একটি অন্যতম ইবাদত। ঈদের দিন গরিবদের খাবারের জন্য শরিয়তপ্রদত্ত একটি ব্যবস্থাপত্র। সাদকাতুল ফিতর সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেছেন, 'তোমরা এ দিনটিতে তাদেরকে অন্যের কাছে চাওয়া থেকে বিরত রাখো'। জাকাতের মতো এটিও দরিদ্র মানুষের ওপর মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত আমলি সহযোগিতা। ইসলামী শরিয়তের হুকুম মোতাবেক ঈদের দিনের ফজরের নামাজের আগে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে তারও ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব।

ফিতরা কী : ইসলামী শরিয়তের হুকুম মোতাবেক এটি একটি ওয়াজিব আমল। ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশকীয় সামগ্রী ছাড়া নিসাব পরিমাণ বা অন্য কোনো পরিমাণ সম্পদের মালিকদের পক্ষ থেকে গরিবদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণের একটি অর্থ প্রদান করার বিশেষ আয়োজনকে সাদকাতুল ফিতর বলা হয়।
ফিতরার পরিমাণ জনপ্রতি আধা সা অর্থাৎ এক সের চৌদ্দ ছটাক বা পৌনে দুই সের গম বা সমপরিমাণ গমের মূল্য ফিতরা হিসেবে প্রদান করতে হবে।

ফিতরার পরিমাণ : আমাদের দেশে প্রতি বছর ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন ইসলামিক সেন্টার মাথাপিছু একটি পরিমাণ ঘোষণা প্রদান করে এবং সে ঘোষণা অনুযায়ী কোটিপতি ও মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে সবাই ফিতরা প্রদান করে। আমাদের জেনে রাখা প্রয়োজন, নবীজি (সা.)-এর যুগে মোট চারটি পণ্য দ্বারা সাদকাতুল ফিতর আদায় করা হতো, যেমন খেজুর, কিশমিশ, জব ও পনির।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমাদের সময় ঈদের দিন এক সা খাদ্য দ্বারা সাদকা আদায় করতাম। আর তখন আমাদের খাদ্য ছিল জব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর। [সহিহ বোখারি]
রাসুল (সা.)-এর যুগে গমের ভালো ফলন ছিল না বিধায় আলোচিত চারটি পণ্য দ্বারাই ফিতরা আদায় করা হতো। এরপর হজরত মুয়াবিয়ার (রা.) যুগে গমের ফলন বেড়ে যাওয়ায় গমকে আলোচিত চারটি পণ্যের সঙ্গে সংযোজন করা হয়। আর তখন গমের দাম ছিল বাকি চারটি পণ্যের তুলনায় বেশি। আর মূলত এই দাম বেশি থাকার কারণেই হজরত মুয়াবিয়া গমকে ফিতরার পণ্যের তালিকভুক্ত করেছিলেন।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর বলেন, 'নবীজি (সা.) এক সা খেজুর বা এক সা জব দিয়ে ফিতরা আদায় করার আদেশ দিয়েছেন। পরবর্তী সময় লোকজন (সাহাবা আজমাইনরা) দুই মুদ গমকে (আধা সা) এগুলোর সমতুল্য মনে করে এবং আদায় করে। [বোখারি]
অতএব, ওপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায়, গম দ্বারা আদায় করলে আধা সা বা এক কেজি ৬২৮ গ্রাম দিলেই ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। আর বাকি চারটি পণ্য অর্থাৎ খেজুর, জব, পনির ও কিশমিশ দ্বারা আদায় করার ক্ষেত্রে জনপ্রতি এক সা বা তিন কেজি ২৫৬ গ্রাম দিতে হবে। দেখা যাচ্ছে যে গম ছাড়া অন্য পণ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করলে এক সা পরিমাণ দিতে হচ্ছে, যা গমের ওজনের দ্বিগুণ এবং মূল্যের দিক দিয়েও অনেক তফাত। হাদিসে এক সা আদায় করার কথা উল্লেখ থাকার পরও তখন এর মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় সাহাবারা আধা সা পরিমাণ গম আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তখন আধা সা গমের মূল্যও অন্য চারটি পণ্যের এক সা-এর চেয়েও বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে আলোচিত পাঁচটি পণ্যের মধ্যে গমই হচ্ছে সবচেয়ে কম দামি পণ্য। তাহলে এখন প্রশ্ন হলো, বর্তমানে গমের পরিমাণ হিসেবে আধা সা ফিতরা আদায় করলে হবে? হাদিসের আলোচনা থেকে এ কথাটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে সাহাবারা খেজুর, জব, পনির ও কিশমিশ থেকে হলে এক সা পরিমাণ এবং গম থেকে হলে আধা সা পরিমাণ ফিতরা আদায় করতেন। কারণ তখন গমের দাম অন্য সব পণ্যের তুলনায় বেশি ছিল। আর বর্তমানে অন্য চারটি পণ্যের তুলনায় গমের দাম কম। এ পর্যন্ত হাদিসের এমন কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি যে সাহাবারা সবাই সর্বনিম্ন দামের বস্তু দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন। বরং তাঁদের সবার আগ্রহ ছিল সর্বাধিক দামি পণ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা। তাহলে বর্তমানে সবাই সর্বনিম্ন দামের পণ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করছে কেন? আমাদের সময়ের সম্পদশালী আর মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে আধা সা গম বা তার সমপরিমাণ মূল্য দ্বারা সাদকাতুল ফিতর আদায় করা সমীচীন হচ্ছে কি? এবং এতে সাদকাতুল ফিতরের আসল হক কি আদায় হচ্ছে?

শরিয়তের বর্ণনা ও হাদিসের আলোচনা অনুযায়ী সমাধান হলো- যার সামর্থ্য অনুযায়ী উল্লিখিত পাঁচটি পণ্যের যেকোনো একটি পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণে ফিতরা আদায় করতেন। যার সামর্থ্য আছে উন্নতমানের খেজুর দ্বারা সে খেজুর দ্বারাই আদায় করবে। আর যার সামর্থ্য আছে কিশমিশ কিংবা জব দ্বারা আদায় করার সে তা দ্বারা আদায় করবে। যার গম দ্বারা আদায় করা ছাড়া অন্য পণ্য দ্বারা আদায় করার সামর্থ্য নেই সে গম দ্বারা ফিতরা আদায় করবে। বেশি সম্পদশালী এবং কম সম্পদশালী নির্বিশেষ গম বা সর্বনিম্ন দামের পণ্য দ্বারা সাদকাতুল ফিতর আদায় করার বিষয়টি বিবেকবর্জিত এবং হাদিস ও শরিয়তের নির্দেশনার পরিপন্থী। তাই আসুন! আমরা সবাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাদকাতুল ফিতর আদায় করি এবং দায়সারা আদায় পদ্ধতি ত্যাগ করি।

ফিতরার আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব: ফিতরা আদায় করা মহান আল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ একটি আদেশ। বিত্তবান মুসলিম নাগরিকের ওপর ফিতরা ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে। গরিব-অসহায় মানুষদের হক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এই সাদকাতুল ফিতরাকে। পবিত্র রমজান মাসে রোজা পালনের পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ মহান ঈদের আনন্দ প্রদান করেছেন। সমাজে বসবাসকারী ধনিক শ্রেণীর মানুষদের সঙ্গে সঙ্গে গরিবরাও যাতে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে, এজন্য এই সাদকাতুল ফিতরের আমলকে ওয়াজিব করা হয়েছে। ফিতরার মাধ্যমে মুসলিম সমাজে বসবাসকারী ধনীদের অর্থ গরিবদের মধ্যে বণ্টিত হয় এবং এ দ্বারা গরিবদের জীবন-যাপনে কিছুটা হলেও গতি ফিরে আসে। এ জন্য ইসলামে সাদকাতুল ফিতরের গুরুত্ব অপরিসীম। এ ফিতরা দানের মাধ্যমে সমাজে বসবাসকারী জনসাধারণের মধ্যে সমতা ফিরে আসে এবং সহযোগিতার মানসিকতার বিস্তার ঘটে। একে অন্যের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক সাধিত হয় এবং এই সামাজিক সম্পর্কের উন্নয়ন হয়।

বিশেষ পরামর্শ:  ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামিক সংস্থা, ইমাম, খতিবসহ যারাই এ বিষয়টির সঙ্গে জড়িত আছেন, সবার উচিত এই বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা এবং সবাইকে আসল ব্যাপারটা বুঝিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী সদকাতুল ফিতর আদায় করার আগ্রহ সৃষ্টি করা। এ ব্যাপারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকেই বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ এটা একটি সরকারি ইসলামী প্রতিষ্ঠান এবং তাদের মতামতের প্রভাব অনেক বেশি। ফিতরা আদায় করা প্রত্যেক উপযুক্ত ব্যক্তির নিজস্ব দায়িত্ব। এটা গরিবের হক। এ হক নষ্ট করা কোনোভাবেই উচিত হবে না। তাই আমাদের সবার উচিত নিজের সঠিক সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের পণ্য দ্বারা সাদকাতুল ফিতর আদায় করার মাধ্যমে নিজে লাভবান হওয়া এবং গরিবদের বেশি বেশি সহযোগিতা করা।